হাদিসসমূহ
#7517
সহীহ বুখারী - Oneness, Uniqueness of Allah (Tawheed)
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এক রাতে কা‘বার মাসজিদ থেকে সফর করানো হয়। বিবরণটি হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এ বিষয়ে ওয়াহী পাঠানোর আগে তাঁর কাছে তিনজন ফেরেশতার একটা জামা‘আত আসল। অথচ তখন তিনি মাসজিদুল হারামে ঘুমিয়ে ছিলেন। এদের প্রথম জন বলল, তিনি কে? মধ্যের জন বলল, তিনি এদের সব চেয়ে ভাল লোক। সর্বশেষ জন বলল, তা হলে তাদের সব চেয়ে ভাল লোকটিকেই নিয়ে চল। সে রাতের ঘটনা এতটুকুই। এ জন্য তিনি আর তাদেরকে দেখেননি। শেষে তারা অন্য এক রাতে আসলেন, যা তিনি অন্তর দ্বারা দেখছিলেন। তাঁর চোখ ঘুমায়, অন্তর ঘুমায় না। সে রকম অন্য নবীগণের (আঃ) চোখ ঘুমিয়ে থাকে, অন্তর ঘুমায় না। এ রাতে তারা তাঁর সঙ্গে কোন কথা না বলে তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে যমযম কূপের কাছে রাখলেন। জিবরীল (আঃ) তাঁর সাথীদের থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দায়িত্ব নিলেন। জিবরীল (আঃ) তাঁর গলায় নিচ হতে বুক পর্যন্ত বিদীর্ণ করলেন এবং তাঁর বুক ও পেট থেকে সবকিছু নেড়েচেড়ে যমযমের পানি দ্বারা নিজ হাতে ধৌত করেন। সেগুলোকে পরিস্কার করলেন, তারপর সোনার একটি তশ্তরী আনা হল। এবং তাতে ছিল একটি সোনার পাত্র যা পরিপূর্ণ ছিল ঈমান ও হিক্মাতে। তাঁর বুক ও গলার রগগুলো এর দ্বারা পূর্ণ করলেন। তারপর সেগুলো যথাস্থানে রেখে বন্ধ করে দিলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে পৃথিবীর আসমানের দিকে উঠলেন। আসমানের দরজাগুলো হতে একটি দরজাতে নাড়া দিলেন। ফলে আসমানবাসীগণ তাঁকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এ কে? তিনি উত্তরে বললেন, জিব্রীল। তারা আবার জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, আমার সঙ্গে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর কাছে কি দূত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন তাঁরা বললেন, মারহাবান ওয়া আহলান (আপনাকে ধন্যবাদ, আপনি আপনজনের মধ্যে এসেছেন)। তাঁর আগমনে আসমানবাসীরা খুবই আনন্দিত। আল্লাহ্ যমীনে কী করতে চাচ্ছেন, তা আসমানবাসীদেরকে না জানানো পর্যন্ত তারা জানতে পারে না। দুনিয়ার আসমানে তিনি আদম (আঃ)-কে পেলেন। জিবরীল (আঃ) তাঁকে দেখিয়ে বললেন, তিনি আপনার পিতা, তাঁকে সালাম দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সালাম দিলেন। আদম (আঃ) তাঁর সালামের উত্তর দিলেন এবং বললেন, মারহাবান ওয়া আহলান হে আমার পুত্র! তুমি আমার কতইনা উত্তম পুত্র। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি প্রবহমান নদী দুনিয়ার আসমানে দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এ নদী দু’টি কোন নদী হে জিবরীল! জিবরীল (আঃ) বললেন, এ দু’টি হলো নীল ও ফুরাতের মূল। এরপর জিবরীল (আঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সঙ্গে নিয়ে এ আসমানে ঘুরে বেড়ালেন। তিনি আরো একটি নদী দেখলেন। এর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল মোতি ও জাবারজাদের তৈরি একটি প্রাসাদ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নদীতে হাত মারলেন। সেটা ছিল অতি উন্নতমানের মিস্ক। তিনি বললেন, হে জিব্রীল! এটি কী? জিবরীল (আঃ) বললেন, হাউযে কাউসার। যা আপনার রব আপনার জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন। তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সঙ্গে করে দ্বিতীয় আসমানে গেলেন। প্রথম আসমানের ফেরেশ্তাগণ তাঁকে যা বলেছিলেন এখানেও তা বললেন। তারা জানতে চাইল, তিনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল! তাঁরা বললেন, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁরা বললেন, তাঁর কাছে কি দূত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তাঁরা বললেন, মারহাবান ওয়া আহলান। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সঙ্গে করে তিনি তৃতীয় আসমানের দিকে গেলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় আসমানের ফেরেশতারা যা বলেছিলেন, তৃতীয় আসমানের ফেরেশতারাও তাই বললেন। তারপর তাঁকে সঙ্গে করে তিনি চতুর্থ আসামনের দিকে গেলেন। তাঁরাও তাঁকে আগের মতই বললেন। তারপর তাঁকে নিয়ে তিনি পঞ্চম আসমানে গমন করলেন। তাঁরাও পূর্বের মতো বললেন। এরপর তিনি তাঁকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দিকে গেলেন। সেখানেও ফেরেশতারা আগের মতই বললেন। সর্বশেষে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে সপ্তম আসমানে গেলে সেখানেও ফেরেশ্তারা তাঁকে আগের ফেরেশতাদের মতো বললেন। প্রত্যেক আসমানেই নবীগণ রয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাম উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে আমি সংরক্ষিত করেছি যে, দ্বিতীয় আসমানে ইদরীস (আঃ), চতুর্থ আসমানে হারুন (আঃ), পঞ্চম আসমানে অন্য একজন নবী, যার নাম আমি স্মরণ রাখতে পারি নি। ষষ্ঠ আসমানে রয়েছে ইব্রাহীম (আঃ) এবং আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার মর্যাদার কারণে মূসা (আঃ) আছেন সপ্তম আসমানে। সে সময় মূসা বললেন, হে আমার রবব। আমি তো ধারণা করিনি আমার ওপর কাউকে উচ্চমর্যাদা দান করা হবে। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এত উপরে উঠানো হলো, যে ব্যাপারে আল্লাহ্ ব্যতীত আর কেউই জানে না। শেষে তিনি ‘সিদরাতুল মুনতাহায়’ পৌঁছলেন। এখানে প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহ্ তাঁর নিকটবর্তী হলেন। অতি নিকটবর্তীর ফলে তাঁদের মাঝে দু’ধনুকের ফারাক রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ্ তাঁর প্রতি ওয়াহী পাঠালেন। অর্থাৎ তাঁর উম্মাতের উপর রাত ও দিনে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের কথা ওয়াহীযোগে পাঠানো হলো। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামলেন। আর মূসার কাছে আসলে মূসা (আঃ) তাঁকে আটকিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার রবব আপনাকে কী নির্দেশ দিলেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রাত ও দিনে পঞ্চাশ বার সালাত আদায়ের। তখন মূসা (আঃ) বললেন, আপনার উম্মাত তা আদায় করতে পারবে না। কাজেই আপনি ফিরে যান, তাহলে আপনার রবব আপনার এবং আপনার উম্মাত হতে এ আদেশটি সহজ করে দেবেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীল (আঃ) এর দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন তিনি এ ব্যাপারে তাঁর থেকে পরামর্শ চাচ্ছিলেন। জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে ইশারায় বললেন হ্যাঁ, আপনি ইচ্ছে করলে তা হতে পারে। তাই তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে প্রথমে আল্লাহর কাছে গেলেন। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথাস্থানে থেকে বললেন, হে আমার রবব! আমার উম্মাত এটি আদায় করতে পারবে না। তখন আল্লাহ্ দশ ওয়াক্ত সালাত কমিয়ে দিলেন। এরপর মূসা (আঃ)-এর কাছে ফিরে আসলে তিনি তাঁকে থামালেন। এভাবেই মূসা তাঁকে তাঁর রবেবর কাছে পাঠাতে থাকলেন। শেষে পাঁচ ওয়াক্ত বাকী থাকল। পাঁচ সংখ্যায়ও মূসা (আঃ) তাঁকে থামিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি আমার বনী ইসরাঈল কাওমের কাছে এটা হতেও সামান্য কিছু পেতে চেয়েছি। তবু তারা দুর্বল হয়েছে এবং পরিত্যাগ করেছে। অথচ আপনার উম্মাত শারীরিক, মানসিক, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি সব দিক দিয়ে আরো দুর্বল। কাজেই আপনি আবার যান এবং আপনার রবব থেকে আদেশটি আরো সহজ করে আনুন। প্রতিবারই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরামর্শের জন্য জিবরাঈলের দিকে তাকাতেন। পঞ্চমবারেও জিবরীল তাঁকে নিয়ে যাত্রা করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আমার রবব! আমার উম্মাতের শরীর, মন, শ্রবণশক্তি ও দেহ খুবই দুর্বল। তাই আদেশটি আমাদের থেকে আরো সহজ করে দিন। এরপর পরাক্রমশালী আল্লাহ্ বললেনঃ মুহাম্মাদ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আপনার নিকট উপস্থিত, বারবার উপস্থিত। আল্লাহ্ বললেন, আমার কথার কোন পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না। আমি তোমাদের উপর যা ফরজ করেছি তা ‘উম্মুল কিতাব’ তথা লাওহে মাহ্ফুযে সংরক্ষিত আছে। প্রতিটি নেক আমলের দশটি নেকী রয়েছে। উম্মুল কিতাবে সালাত পঞ্চাশ ওয়াক্তই লেখা আছে। তবে আপনার ও আপনার উম্মাতের জন্য তা পাঁচ ওয়াক্ত করা হলো। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসার কাছে ফিরে আসলে মূসা (আঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী ব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ্ আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিটি নেক আমলের বদলে দশটি সাওয়াব নির্ধারিত করেছেন। তখন মূসা (আঃ) বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি বনী ইসরাঈলের নিকট হতে এর চেয়েও অল্প জিনিসের আশা করেছি। কিন্তু তারা তাও আদায় করেনি। আপনার রবেবর কাছে আপনি আবার ফিরে যান, যেন তিনি আরো একটু কমিয়ে দেন। এবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে মূসা, আল্লাহর শপথ! আমি আমার রবেবর কাছে বারবার গেছি। আবার যেতে লজ্জাবোধ করছি, যেন তাঁর সঙ্গে মতভেদ করছি। এরপর মূসা (আঃ) বললেন, নামতে পারেন আল্লাহর নামে। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত হলেন, দেখলেন, তিনি মসজিদে হারামে আছেন। [৩৫৭০; মুসলিম ১/৭৪, হাঃ ১৬২, আহমাদ ১২৫০৭] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৯৯৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
Metadata
- Edition
- সহীহ বুখারী
- Book
- Oneness, Uniqueness of Allah (Tawheed)
- Hadith Index
- #7517
- Book Index
- 142
Grades
- -