হাদিসসমূহ
#2468
সহীহ বুখারী - Oppressions
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সহধর্মিণীদের মধ্যে ঐ দু’সহধর্মিণী সম্পর্কে উমার (রাঃ)-এর কাছে জিজ্ঞেস করতে সব সময় আগ্রহী ছিলাম, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ ‘‘যদি তোমরা দু’জনে তাওবা কর (তাহলে সেটাই হবে কল্যাণকর)। কেননা, তোমাদের অন্তর বাঁকা হয়ে গেছে’’- (তাহরীমঃ ৪)। একবার আমি তাঁর [উমার (রাঃ)-এর] সঙ্গে হাজ্জে রওয়ানা করলাম। তিনি রাস্তা হতে সরে গেলেন। আমিও একটি পানির পাত্র নিয়ে তাঁর সঙ্গে গতি পরিবর্তন করলাম। তিনি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে এলেন। আমি পানির পাত্র হতে তাঁর দু’হাতে পানি ঢাললাম, তিনি অযু করলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আমীরুল মু’মিনীন! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সহধর্মিণীদের মধ্যে দু’সহধর্মিণী কারা ছিলেন, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ ‘‘যদি তোমরা দু’জন তওবা কর (তবে সেটাই হবে তোমাদের জন্য কল্যাণকর) কেননা, তোমাদের অন্তর বাঁকা হয়ে গেছে’’- (তাহরীমঃ ৪)। তিনি বললেন, হে ইবনু ‘আব্বাস! এটা তোমার জন্য তাজ্জবের বিষয় যে, তুমি তা জান না। তারা দু’জন হলেন, ‘আয়িশাহ ও হাফসা (রাযি.) অতঃপর উমার (রাঃ) পুরো ঘটনা বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, আমি ও আমার এক আনসারী প্রতিবেশী মাদ্বীনার অদূরে বনূ উমাইয়া ইবনু যায়দের মহল্লায় বসবাস করতাম। আমরা দু’জন পালাক্রমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট হাযির হতাম। একদিন তিনি যেতেন, আরেকদিন আমি যেতাম, আমি যে দিন যেতাম সে দিনের খবর (ওয়াহী) ইত্যাদি বিষয় তাঁকে অবহিত করতাম। আর তিনি যে দিন যেতেন, তিনিও অনুরূপ করতেন। আর আমরা কুরাইশ গোত্রের লোকেরা মহিলাদের উপর কর্তৃত্ব করতাম। কিন্তু আমরা যখন মাদ্বীনায় আনসারদের কাছে আসলাম তখন তাদেরকে এমন পেলাম, যাদের নারীরা তাদের উপর কর্তৃত্ব করে থাকে। ধীরে ধীরে আমাদের মহিলারাও আনসারী মহিলাদের রীতিনীতি গ্রহণ করতে লাগল। একদিন আমি আমার স্ত্রীকে ধমক দিলাম। সে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিউত্তর করল। আর এই প্রতিউত্তর আমার পছন্দ হল না। তখন সে আমাকে বলল, আমার প্রতিউত্তরে তুমি অসন্তুষ্ট হও কেন? আল্লাহর কসম! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সহধর্মিণীরাওতো তাঁর কথার প্রতিউত্তর করে থাকেন এবং তাঁর কোন কোন সহধর্মিণী রাত পর্যন্ত পুরো দিন তাঁর কাছ হতে আলাদা থাকেন। এ কথা শুনে আমি ঘাবড়ে গেলাম। বললাম, যিনি এরূপ করেছেন তিনি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারপর আমি জামা-কাপড় পরে (আমার মেয়ে) হাফসাহ (রাযি.)-এর কাছে গিয়ে বললাম, হে হাফসা! তোমাদের কেউ কেউ নাকি রাত পর্যন্ত পুরো দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে অসন্তুষ্ট রাখে। সে বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, তবে তো সে বরবাদ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তোমার কি ভয় হয় না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসন্তুষ্ট হলে আল্লাহও অসন্তুষ্ট হবেন। এর ফলে তুমি বরবাদ হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে বাড়াবাড়ি করো না এবং তাঁর কোন কথার প্রতিউত্তর দিও না এবং তাঁর হতে পৃথক থেক না। তোমার কোন কিছুর দরকার হয়ে থাকলে আমাকে বলবে। আর তোমার প্রতিবেশী তোমার চেয়ে অধিক সুন্দরী এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর অধিক প্রিয় এ যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে। তিনি উদ্দেশ্য করেছেন ‘আয়িশাহ (রাযি.)-কে। সে সময় আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল যে, গাস্সানের লোকেরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ঘোড়াগুলিকে প্রস্তুত করছে। একদিন আমার সাথী তার পালার দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে গেলেন এবং ঈশার সময় এসে আমার দরজায় খুব জোরে করাঘাত করলেন এবং বললেন, তিনি [‘উমার (রাঃ)] কি ঘুমিয়েছেন? তখন আমি ঘাবড়িয়ে তাঁর কাছে বেরিয়ে এলাম। তিনি বললেন, সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে। আমি বললাম, সেটা কী? গাস্সানের লোকেরা কি এসে গেছে? তিনি বললেন, না, বরং তার চেয়েও বড় ঘটনা ও বিরাট ব্যাপার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহধর্মিণীদেরকে তালাক দিয়েছেন। ‘উমার (রাঃ) বললেন, তাহলে তো হাফসার সর্বনাশ হয়েছে এবং সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমার তো ধারণা ছিল যে, এমন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। আমি কাপড় পরে বেরিয়ে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে ফজরের সালাত আদায় করলাম। সালাত শেষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোঠায় প্রবেশ করে একাকী বসে থাকলেন। তখন আমি হাফসাহ (রাযি.)-এর কাছে গিয়ে দেখি সে কাঁদছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কাঁদছ কেন? আমি কি তোমাকে আগেই সতর্ক করে দেইনি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তোমাদেরকে তালাক দিয়েছেন? সে বলল, আমি জানি না। তিনি তাঁর ঐ কোঠায় আছেন। আমি বের হয়ে মিম্বরের কাছে আসলাম, দেখি যে লোকজন মিম্বরের চারপাশ জুড়ে বসে আছেন এবং কেউ কেউ কাঁদছেন। আমি তাঁদের সঙ্গে কিছুক্ষণ বসলাম। তারপর আমার ঔৎসুক্য প্রবল হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কোঠায় ছিলেন, আমি সে কোঠার কাছে আসলাম। আমি তাঁর এক কালো গোলামকে বললাম, উমারের জন্য অনুমতি গ্রহণ কর। সে প্রবেশ করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে আলাপ করে বেরিয়ে এসে বলল, আমি আপনার কথা তাঁর কাছে উল্লেখ করেছি, কিন্তু তিনি নীরব রইলেন। আমি ফিরে এলাম এবং মিম্বরের পাশে বসা লোকদের কাছে গিয়ে বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর আমার আবার উদ্বেগ প্রবল হল। তাই আমি আবার এসে গোলামকে বললাম। (‘উমারের জন্য অনুমতি গ্রহণ কর) এবারও সে আগের মতোই বলল। তারপর যখন আমি ফিরে আসছিলাম, গোলাম আমাকে ডেকে বলল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন। এখন আমি তাঁর নিকট প্রবেশ করে দেখি, তিনি খেজুরের পাতায় তৈরী ছোবড়া ভর্তি একটা চামড়ার বালিশে হেলান দিয়ে খালি চাটাই এর উপর কাত হয়ে শুয়ে আছেন। তাঁর শরীর ও চাটাই এর মাঝখানে কোন ফরাশ ছিল না। ফলে তাঁর শরীরের পার্শ্বদেশে চাটাইয়ের দাগ পড়ে গেছে। আমি তাঁকে সালাম করলাম এবং দাঁড়িয়ে আবার আরয করলাম, আপনি কি আপনার সহধর্মিণীদেরকে তালাক দিয়েছেন? তখন তিনি আমার দিকে চোখ তুলে তাকালেন এবং বললেন, না। তারপর আমি (থমথমে ভাব কাটিয়ে) অনুকূল ভাব সৃষ্টির জন্য দাঁড়িয়ে থেকেই বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখুন, আমরা কুরাইশ গোত্রের লোকেরা নারীদের উপর কর্তৃত্ব করতাম। তারপর যখন আমরা এমন একটি সম্প্রদায়ের নিকট এলাম, যাদের উপর তাদের নারীরা কর্তৃত্ব করছে। তিনি এ ব্যাপারে আলোচনা করলেন। এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসলেন। তারপর আমি বললাম, আপনি হয়তো লক্ষ্য করছেন যে, আমি হাফসার ঘরে গিয়েছি এবং তাকে বলেছি, তোমাকে এ কথা যেন ধোঁকায় না ফেলে যে, তোমার প্রতিবেশিনী (সতীন) তোমার চেয়ে অধিক আকর্ষণীয় এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর অধিক প্রিয়। এ কথা দ্বারা তিনি ‘আয়িশাহ (রাযি.)-কে বুঝিয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার মুচকি হাসলেন। তাঁকে একা দেখে আমি বসে পড়লাম। তারপর আমি তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের ভিতর এদিক সেদিক দৃষ্টি করলাম। কিন্তু তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে তিনটি কাঁচা চামড়া ব্যতীত দৃষ্টিপাত করার মতো আর কিছুই দেখতে পেলাম না, তখন আমি আরয করলাম, আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করুন, তিনি যেন আপনার উম্মাতকে পার্থিব স্বচ্ছলতা দান করেন। কেননা, পারস্য ও রোমের অধিবাসীদেরকে স্বচ্ছলতা দান করা হয়েছে এবং তাদেরকে পার্থিব (অনেক প্রাচুর্য) দেয়া হয়েছে, অথচ তারা আল্লাহর ইবাদত করে না। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন হেলান দিয়ে ছিলেন। তিনি বললেন, হে ইবনু খাত্তাব! তোমার কি এতে সন্দেহ রয়েছে যে, তারা তো এমন এক জাতি, যাদেরকে তাদের ভালো কাজের প্রতিদান দুনিয়ার জীবনেই দিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য ক্ষমার দু‘আ করুন। হাফসাহ (রাযি.) ‘আয়িশাহ (রাযি.)-এর কাছে এ কথা প্রকাশ করলেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহধর্মিণীদের হতে আলাদা হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর কসম! আমি এক মাস তাদের কাছে যাব না। তাঁদের উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ভীষণ রাগের কারণে তা হয়েছিল। যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। যখন ঊনত্রিশ দিন কেটে গেল, তিনি সর্বপ্রথম ‘আয়িশাহ (রাযি.)-এর কাছে এলেন। ‘আয়িশাহ (রাযি.) তাঁকে বললেন, আপনি কসম করেছেন যে, এক মাসের মধ্যে আমাদের কাছে আসবেন না। আর এ পর্যন্ত আমরা ঊনত্রিশ রাত অতিবাহিত করেছি, যা আমি ঠিক ঠিক গণনা করে রেখেছি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মাস ঊনত্রিশ দিনেও হয়। আর মূলত এ মাসটি ঊনত্রিশ দিনেরই ছিল। ‘আয়িশাহ (রাযি.) বলেন, যখন ইখতিয়ারের আয়াত নাযিল হল, তখন তিনি তাঁর সহধর্মিণীদের মধ্যে সর্বপ্রথম আমার কাছে আসলেন এবং বললেন, আমি তোমাকে একটি কথা বলতে চাই, তবে তোমার পিতা-মাতার সঙ্গে পরামর্শ না করে এর জওয়াবে তুমি তাড়াহুড়ো করবে না। ‘আয়িশাহ (রাযি.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা জানতেন যে, আমার পিতা-মাতা তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে আলাদা হওয়ার পরামর্শ আমাকে কখনো দিবেন না। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেনঃ ‘‘হে নবী! আপনি আপনার সহধর্মিণীদের বলুন। তোমরা যদি পার্থিব জীবন এবং তার চাকচিক্য কামনা কর, তবে আস; আমি তোমাদেরকে কিছু সম্বল প্রদান করি আর তোমাদেরকে সদ্ভাবে বিদায় করে দেই। আর যদি তোমরা আল্লাহ তা‘আলাকে (এবং) তাঁর রাসূলকে চাও এবং কামনা কর পরলোক, তবে তোমার অন্তর্গত সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ তা‘আলা মহাপ্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন’’- (আহযাবঃ ২৮-২৯)। আমি বললাম, এ ব্যাপারে আমি আমার পিতা-মাতার কাছে কী পরামর্শ নিব? আমি তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি এবং পরকালীন (সাফল্য) পেতে চাই। তারপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অন্য সহধর্মিণীদেরকেও ইখতিয়ার দিলেন এবং প্রত্যেকে সে একই জবাব দিলেন, যা ‘আয়িশাহ (রাযি.) দিয়েছিলেন। (৮৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৮৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ)
Metadata
- Edition
- সহীহ বুখারী
- Book
- Oppressions
- Hadith Index
- #2468
- Book Index
- 29
Grades
- -